অদ্ভুত এক দেশে বাস করছি…। ভালোর চেয়ে মন্দের কদর বেড়ে গেছে। অনেকে কথায় কথায় বলে থাকেন, সৎ মানুষের পৃথিবীতে কোনও দাম নেই। তাই দেখতে পাচ্ছি বাংলাদেশে। আর বিচলিত হচ্ছি। বেশ খানিকটা সামনের দিকে এগিয়ে আবারও কি আমরা পেছনের দিকে হাঁটতে শুরু করেছি?
নতুন সরকারের কাছে মানুষের অনেক প্রত্যাশা। দশ বছরে জঙ্গিবিরোধী সফল অভিযান, পদ্মা সেতুর উঁকি মারা, জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৮ অংকের ঘর অতিক্রম, মেট্রোরেলের কর্মযজ্ঞসহ চোখে পড়ার মতো আরও অনেক কাজ জন্ম দিয়েছে এই প্রত্যাশা। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে প্রত্যাশা ছিল- এবার অবশ্যই ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে, খেলাপি ঋণ কমবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজস্ব ক্ষমতাবলে ব্যাংকিং খাত পরিচালনা করবে।
শুরুতে তেমন আভাসও মিললো। ৭ জানুয়ারি নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের পর নতুন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ঘোষণা দিলেন, ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ’আর এক টাকাও’ বাড়বে না। অর্থমন্ত্রী যখন এই ঘোষণা দেন তখন তার বাম পাশে ছিলেন সালমান এফ রহমান। যিনি এবার প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। আইএফআইসি ব্যাংকের চেয়ারম্যান তিনি। বেক্সিমকো গ্রুপের ভাইস-চেয়ারম্যান। প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি খাত, শিল্প ও বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টাও তিনি।
নতুন অর্থমন্ত্রী যখন সালমান এফ রহমানকে পাশে নিয়ে ব্যাংকিং খাতের প্রধান সমস্যা খেলাপি ঋণ ’আর এক টাকাও’ বাড়বে না বলে ঘোষণা দিলেন, তখন সবাই আশান্বিত হয়েছিল এবার বোধ হয় কিছু একটা হবে। ঋণ খেলাপিরা ঋণ পরিশোধ করেই খেলাপি ঋণ কমাবে। ব্যাংকিং খাত তথা অর্থনীতিতে নতুন করে প্রাণ সঞ্চার হবে।
কিন্তু এক মাস যেতে না যেতেই খেলাপি ঋণ কমানোর একটা সহজ পথ বের করে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। ঋণ অবলোপন (রাইট অফ) নীতিমালায় শিথিলতার মাধ্যমে এ সুযোগ দেওয়া হয়।
৬ ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঋণ অবলোপনের নীতিমালায় যে সংশোধন আনে তাতে ব্যাংকগুলো এখন মাত্র তিন বছরের মন্দ মানের খেলাপি ঋণ ব্যালেন্স শিট থেকে বাদ দিতে পারবে। এতদিন কোনও ঋণ মন্দ মানে শ্রেণিকৃত হওয়ার পাঁচ বছর পার না হলে তা অবলোপন করা যেত না।
অন্যদিকে অবলোপনের জন্য এখন আর আগের মতো শতভাগ প্রভিশন লাগবে না। আবার দুই লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ অবলোপনে মামলা করতে হবে না। এতদিন মামলা না করে অবলোপন করা যেত ৫০ হাজার টাকা।
বছরের পর বছর ধরে ব্যাংক ব্যবস্থায় মন্দ মানে শ্রেণিকৃত খেলাপি ঋণ স্থিতিপত্র (ব্যালেন্স শিট) থেকে বাদ দেওয়াকে ঋণ অবলোপন বা রাইট অফ বলে। যদিও এধরনের ঋণ গ্রহীতা পুরো টাকা পরিশোধ না করা পর্যন্ত খেলাপি হিসেবে বিবেচিত হন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালার আলোকে ২০০৩ সাল থেকে ব্যাংকগুলো ঋণ অবলোপন করে আসছে। ক্ষুদ্র ঋণে মামলার খরচের চেয়ে অনেকাংশে বকেয়া ঋণের পরিমাণ কম হওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ২০১৩ সালে মামলা না করেই ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ অবলোপনের সুযোগ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালা শিথিলের ফলে এক ধাক্কায় খেলাপি ঋণ অনেক কমে আসবে। এতে খেলাপি ঋণ আদায় না হলেও তা কাগজ-কলমে কমবে।
এরপর যারা ব্যাংক থেকে ধার করে শোধ করেননি, তাদের ’ঋণ খেলাপি’ তকমা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য আরও একটি সুযোগ দেন অর্থমন্ত্রী। ২৫ মার্চ তিনি ঘোষণা দেন, যারা ঋণ শোধ করতে না পারার ’যৌক্তিক’ কারণ ব্যাখ্যা করতে পারবেন, তাদেরকে মোট ঋণের ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্টে ৭ শতাংশ সুদে ১২ বছরে ওই টাকা পরিশোধের সুযোগ দেওয়া হবে।
এক সপ্তাহ পর ২ এপ্রিল অর্থমন্ত্রী বললেন, ৭ শতাংশ নয়, ঋণখেলাপিরা ৯ শতাংশ সুদে ঋণ শোধ করতে পারবেন। পয়লা মে থেকে নতুন এ সুবিধা কার্যকর হবে।
এখানেই শেষ নয়। ঋণ খেলাপিদের জন্য আরও ছাড় দিল বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন ব্যবসায়ীরা চাইলে মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আরও ছয় মাস টাকা না দিয়ে খেলাপিমুক্ত থাকতে পারবেন। এতে একজন ব্যবসায়ী ঋণ পরিশোধের জন্য আগের চেয়ে তিন থেকে ছয় মাস পর্যন্ত অতিরিক্ত সময় পাবেন।
২০১২ সালে ঋণ নীতিমালা আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। ২১ এপ্রিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ঋণ শ্রেণিকরণ ও সঞ্চিতি সংরক্ষণের নীতিমালায় পরিবর্তন এনে ঋণখেলাপিদের নতুন করে এ সুযোগ করে দিয়েছে, যা কার্যকর হবে আগামী জুন থেকে।
সর্বশেষ ২৫ এপ্রিল ঋণ খেলাপিদের প্রতি অর্থমন্ত্রীর মুখে প্রেম-ভালোবাসা কথা শুনে অবাক হয়ে গেলাম।
২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেট নিয়ে এক আলোচনায় তিনি বললেন, ঋণ খেলাপিদের জেলে পাঠালে দেশ চলবে না।
হায়রে বাংলাদেশ! এই দেশে এক-দেড় হাজার টাকা কৃষি ঋণ খেলাপির জন্য কৃষককে হাতকড়া পরিয়ে জেলে পাঠানোর অনেক ছবি আমরা দেখেছি। আর হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে ব্যাংকগুলোকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে যারা বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে তাদের জেলে পাঠাতে চান না আমাদের মন্ত্রী মহোদয়। উল্টো তাদের আদর-যত্ন করে একটার পর একটা সুবিধা দিচ্ছেন।
আর এতে ক্ষুব্ধ হচ্ছেন ভালো উদ্যোক্তা, ঋণ গ্রহীতারা। পেশাগত কারণে কমপক্ষে দশ জন ব্যবসায়ী-শিল্পপতির সঙ্গে এ বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছি। তারা বলেছেন, যারা ১৫/১৬ শতাংশ সুদে ঋণ নিয়ে খেলাপি না হয়ে নিয়মিত কিস্তি শোধ করে অর্থনীতিতে অবদান রেখে চলেছেন, তাদেরকে সেই ১৫/১৬ শতাংশ সুদেই ঋণ পরিশোধ করতে হবে। আর যারা ঋণ নিয়ে শোধ না করে ইচ্ছে করে খেলাপি হয়েছে তারা ৯ শতাংশ সুদে ঋণ পরিশোধ করতে পারবে। এটা কেমন বিচার? সরকারের এ অদ্ভুত সিদ্ধান্তের ফলে ভালো ঋণ গ্রহীতারাও এখন ঋণ শোধ না করে খেলাপি হবেন বলে মনে করছেন তারা।
গত সরকারের সময়ে ব্যাংকমালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস এর চাপে ব্যাংকের করপোরেট কর ২ দশমিক ৫ শতাংশ কমিয়ে দেওয়া হয়। এরও আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বেসরকারি ব্যাংকগুলোর নগদ জমার হার (সিআরআর) ১ শতাংশ কমায়। টানা ৯ বছর ব্যাংকের পরিচালক থাকা ও এক পরিবারের ৪ জনকে ব্যাংকের পর্ষদে থাকার সুযোগ দিয়ে আইনে পরিবর্তন আনা হয়। সরকারি আমানত বেসরকারি ব্যাংকে রাখার সীমাও ২৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করা হয়। তখন তারা বলেছিলেন, সুদ হার এক অঙ্কে নামিয়ে আনবেন। যদিও সুদ হার এখনো ১৫ শতাংশের বেশি রয়ে গেছে।
২০১৫ সালে ঋণখেলাপিদের জন্য ঋণ পুনর্গঠন নীতিমালা জারি করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।তখন ১১টি শিল্প গ্রুপের ১৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ নিয়মিত করে বড় ধরনের সুবিধা দেওয়া হয়। তবে সুবিধা পাওয়ার পরও দুটি গ্রুপ ছাড়া আর কেউ টাকা পরিশোধ করছে না।
যে খেলাপি ঋণ নিয়ে এতো আলোচনা তার সর্বশেষ তথ্যটাও বোধ করি সবার জানা দরকার। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সালের শুরুতে বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। ২০১৮ সাল শেষে খেলাপি ঋণ বেড়ে হয়েছে ৯৩ হাজার ৯১১ কোটি টাকা। এ ছাড়া অবলোপন ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৩৭ হাজার ৮৬৬ কোটি টাকা। ফলে ব্যাংক খাতে মোট খেলাপি ঋণ এখন ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি। এই অর্থ চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটের এক তৃতীয়াংশেরও বেশি।
এই বিশাল অংকের টাকা যাদের কাছে আটকে আছে সেই মহান ব্যক্তিদের জন্য কে জানে আরও কতো কি সুযোগ-সুবিধা অপেক্ষা করছে…!
আমাদের পাবনা জেলায় একটা কথা খুব প্রচলিত আছে- কোনও ভালো মানুষের খারাপ হলে বা বিপদে পড়লে তার আশপাশের লোকজন বলেন, "ভালো মানুষের খাওয়া নাই রে ভাই।"
আমাদের ব্যাংকিং খাতেও দেখছি সেই অবস্থা হয়েছে। অর্থমন্ত্রী ভালো মানুষদের কেন জানি পছন্দ করছেন না…! নাকি খারাপদের ভিড়ে ভালোদের কথা ভাববার সময়ই তিনি পাচ্ছেন না?