দেবি শেঠি এমবিবিএস পাশ করেন ১৯৭৯ সালে। তখন তাঁর বয়স মাত্র ২৬। জেনারেল সার্জারিতে তিনি পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন শেষ করেছেন ১৯৮২ সালে। তখন তাঁর বয়স মাত্র ২৯।
এবার ধরি ডা. শেঠি একজন বাংলাদেশী চিকিৎসক।
২৬-এ এমবিবিএস পাশ করার পর প্রথম এক বছর তাঁর কেটে গেছে বিভিন্ন ক্লিনিকে ক্ষ্যাপ মেরে। ক্লিনিকে ১০০ টাকা প্রতি ঘন্টা মজুরিতে কাজ করার ফাঁকে মাথার চুল ছিড়েছেন এই ভেবে – এফসিপিএস দিবেন? বিসিএস দিবেন? নাকি এমএস দিবেন?
অনেক ভেবে তিনি শেষ পর্যন্ত বিসিএসই বেছে নিলেন। এই দেশে বিসিএস ছাড়া যেহেতু খুব একটা গতি নেই।
২৭ বছর বয়সে বিসিএস প্রিলি দিলেন শেঠি।
যেহেতু তিনি মেধাবী সেহেতু খুব সহজে তিনি ’এসিউর‍্যান্স ডাইজেস্ট’ মুখস্ত করে ফেললেন এবং প্রথমবারেই বিসিএস-এ টিকে গেলেন।
কিন্তু সেই বিসিএস এর পোস্টিং হতে হতে উনার বয়স ৩০।
পোস্টিং-এর অপেক্ষায় থেকে থেকে মেধাবী শেঠি একটু মেডিকেল পড়ার চেষ্টা করেছিলেন।
কিন্তু মাথাটা তো মানুষেরই। খুব একটা সুবিধা করতে পারেননি। সকালে পড়েছেন ক্যাপ্টোপ্রিলের হাফ লাইফ, বিকালে পড়েছেন সুপসুপা সমাসের উদাহারণ। কী একটা অবস্থা!
প্রথমবার এফসিপিএস পার্ট ওয়ান পরীক্ষা দিলেন তিনি ২৯ বছর বয়সে। সেবার পাশের হার ছিলো ৪.৩ পার্সেন্ট। তা যা-ই হোক, মেধাবী শেঠি বলে কথা। উনাকে আটকায় সাধ্যি কার?
এফসিপিএস ট্রেইনিং-এ ঢুকার আগেই বিসিএস পোস্টিং হয়ে গেলো।
গ্রামে চাকরি করে ফিরলেন ট্রেইনিং-এ। বয়স তখন ৩৩।
ট্রেইনিং করলেন ৪ বছর। প্রথমবারেই পাশ করে ফেললেন এফসিপিএস পার্ট টু। সেবার পাশের হার ছিলো ৬.৯ পার্সেন্ট। যা-ই হোক। শেঠি বলে কথা। পাশ করার পরে উনার বয়স তখন ৩৭।
গল্পের শেঠি এখন জেনারেল সার্জন।
এই যখন অবস্থা তখন ভাবলেন, এভাবে তো হবে না! তাঁর তো ছোটবেলার ইচ্ছা কার্ডিয়াক সার্জন হবেন।
কার্ডিয়োথোরাসিক সার্জারিতে এমএসটা তাহলে দিতেই হবে। এবারই এমএস-এ ঢুকে গেলে ৪১ বছর বয়সে তিনি কার্ডিয়াক সার্জন হয়ে যাবেন। মন্দ কী?
কিন্তু এ কী! সরকারের নতুন নিয়ম! এক ডাক্তার দুইবার শিক্ষাছুটি পাবেন না! যেহেতু তিনি এফসিপিএস করে ফেলেছেন অতএব আর এমএস করতে পারবেন না।
শেঠির মাথায় হাত! লও ঠ্যালা!
কী আর করা!
গল্পের শেঠি এখন নামকরা জেনারেল সার্জন। তিনি প্রচুর অপারশন করেন। তার প্রচুর টাকা।
ওদিকে বাস্তবের শেঠি ২৯ বছর বয়সে জেনারেল সার্জন হয়ে বসে আছেন।
৩৫-এ কার্ডিয়াক সার্জন।
৩৭-এ ভারতে ৯ দিন বয়সী বাচ্চা রনির কার্ডিয়াক সার্জারি করে ফেলেছেন।
৪৮-এ নারায়ানা হৃদয়ালায়া প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছেন।
৫০-এ উনার ১৫০০০ কার্ডিয়াক সার্জারি করা শেষ।
৬০-এ উনি বাংলাদেশে এসে এক রাজনীতিবিদকেও দেখে গেছেন।

পুনশ্চ – গল্পের শেঠিকে কতবার উপজেলায় মার খেতে হয়েছে, কতবার মেম্বারের বউ-এর কাশির জন্য রাতের বেলা তাঁর বাসায় যেতে হয়েছে, ট্রেইনিং পোস্টের জন্য কতবার দৌড়াদৌড়ি করতে হয়েছে তা এখানে উহ্য রাখলাম।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
জনাব ওবায়েদুল কাদেরের চিকিৎসার জন্য ডা. শেঠিকে আনতে হয়েছে ভারত থেকে। এবার অন্তত ভেবে দেখুন আমাদের এখানকার দেবি শেঠিরা কোথায়? এরা কোন উপজেলায়, কোন বিসিএস কোচিং সেন্টারে, কোন মেসে, কোন ক্লিনিকে, কোথায় কোর্স আউট হয়ে, কোন মাছ বাজারের পাশের চেম্বারে পড়ে আছে একটু খোঁজ নিয়ে দেখুন। শুধু দেবি শেঠিদের না, অনেক প্রশ্নের উত্তরও পেয়ে যাবেন সাথে।




লেখক: ডাঃ আলিম আল রাজি
এফসিপিএস ,এমবিবিএস
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। বাংলাদেশ টুডে এবং বাংলাদেশ টুডে-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)