সম্প্রতি সারা বিশ্বে একটি বিষয় নিয়ে শুরু হয়েছে নানা ধরনের আলোচনা সমালোচনা।সবখানেই এই বিষয়টি সাড়া ফেলেছে।সবাই বলছে নানা ধরনের কথা বার্তা। আর সাড়া জাগানো এই ঘটানটি হচ্ছে বিশ্বের সাবেক সেরা ধনী বিল গেটসের বিবাহ বিচ্ছেদ। আর এই ঘটনাটি নিয়ে সারা বিশ্বের মত বাংলাদেশেও তৈরী হয়েছে নানা ধরনের আলোচনা। বিশেষ করে বাংলাদেশে এ নিয়ে ট্রল হচ্ছে সব থেকে বেশি। সম্প্রতি এ নিয়ে একটি রম্য লেখা লিখেছেন দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব আহসান হাবিব।পাঠকদের উদ্দেশ্যে তার সেই লেখনি তুলে ধরা হলো;
বিল গেটস ও মেলিন্ডার বিয়ে বিচ্ছেদের পর অনেকেই ভাবছেন ’মাইক্রোসফট’ চালানোর চেয়ে সংসার চালানো কঠিন। বলা হয়ে থাকে বিয়ের কথা লিখেন স্বয়ং ঈশ্বর,আর বিচ্ছেদ লেখা হয় শয়তানের ডায়েরিতে। যুক্তরাষ্ট্রের ফিল্মিরাজ্য খ্যাত হলিউড কিংবা ভারতের বলিউডে প্রচলিত কথা এমন- বিয়ে হয় স্বর্গে আর ভাঙ্গে হলিউডে (কিংবা বলিউডে)! তবে হলিউড বা বলিউডের বাতাস পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পরছে। খোদ ঢাকা শহরে প্রতিদিন নাকি চল্লিশটির মতো বিয়ে বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটে। বিচ্ছেদ বাস্তবতার বর্তমান হাল সম্পর্কে বাংলা ছবি বহুদিন আগেই ধারণা করতে পেরেছিল। সেকারণে এক বাংলা ছবির গান ছিল এমন- কেউ ভেঙ্গেছে ট্রয় নগরী কেউ ভেঙ্গেছে সিংহাসন/সবই তো নারীরই কারণ!/আমি তো তাদেরই একজন/আজকের দিনটাতে/ভরে নাও মনটাকে..

বিচ্ছেদ ’মন ভরা’ কোন কারণ নয়, বরং এটা দুইজন মানুষের মন ভাঙ্গার গল্প। দশ ফুট বাই দশ ফুট কামরার ভেতর যে তোমার আমার ’লাল নীল সংসার’ সেটা ভাঙ্গার গল্প। হয়তো কোন এক ’শঙ্খ নীল কারাগার’ থেকে বেরিয়ে নতুন কোন ’নন্দিত নরকে’র দিকে যাত্রা করার গল্প। একসাথে পথচলার কুড়ি বছর পরেও কেউ হয়তো বুঝতেই পারেন না যে একজনের থেকে অন্যজনের পথ বহু আগেই ভিন্ন হয়ে গেছে। ’আজ দু জনার দুটো পথ দুই দিকে গেছে বেকে’র একমাত্র সমাধান তখন বিচ্ছেদ। আর প্রতিটি বিচ্ছেদ কোন না কোনভাবে অসমাপ্ত প্রেমের গল্প। জার্মানিতে কাব্য করে এ বিচ্ছেদকে বলা হয় ’রোজেনক্রিগ’, যার বাংলা মানে গোলাপের জন্য যুদ্ধ।

বাংলায় প্রচলিত কথা এমন-সংসার ফুলের বাগান। সংসার সাধারণত আলোচনার মাধ্যমে মেনে নেওয়ার, ভালোবাসা বিকাশের জন্য এক ছাদের নিচে গণতান্ত্রিক ও জৈবিক বসবাস। সংসার অবশ্যই নিয়ম করে ঘরে ফেরার এবং ঘর চালানোর জন্য ’রেজিমেন্টেশন’ বা শৃঙ্খল আশা করে। কিন্তু সংসার যখনই ’শৃঙ্খল’ হয়ে দাঁড়ায়, বিচ্ছেদ সেখানে অনিবার্য হয়ে দেখা দেয়। আবার বিচ্ছেদের পরেও যে দুজনের মন ভালো থাকে তেমন নয়। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় হয়তো এমন- "তখন চেতনা হয় এবং দ্বিতীয় ভ্রান্তিপাশে পড়িবার জন্য চিত্ত আকুল হইয়া ওঠে।" গানে যেমন- "বিচ্ছেদের অনলে সদা অঙ্গ জ্বলে/মিনতি করি প্রিয়া আয় আয় রে!" বিচ্ছেদ বেদনার, কখনো কখনো প্রয়োজনীয়, এমন কী সাহসেরও।

বিয়ে বিচ্ছেদ নিয়ে সবচেয়ে প্রচলিত একটা কৌতুক এমন- "অ্যারেঞ্জড ম্যারেজে বিচ্ছেদের সংখ্যা তুলনামূলক কম কেন? উত্তর হচ্ছে- যারা নিজেরা সাহস কইরা নিজের বিয়েটাই করতে পারে না তারা আবার ডিভোর্স দিবে কোন সাহসে?"

এ সাহস যেমন বিচ্ছেদে লাগে তেমনি কখনো কখনো কখনো প্রযোজনীয় হয়ে দাঁড়ায়। বলা হয়ে থাকে- আঙুলে যদি ক্যান্সার দেখা দেয় তাহলে সবচেয়ে ভালো কনুই পর্যন্ত হাতটা কেটে ফেলা। একটু সুখের জন্য নিজের মতো করে বাঁচাটাই আসল। বিয়ে পরবর্তী জীবনে কখনো সখনো ’ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স’ও দেখা দেয়। বোঝাপড়ার অভাব, ছেলে-মেয়ে মানুষ করা নিয়ে দ্বন্দ্ব, ব্যক্তি স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, মেয়েদের চাকরি করা, অভিনয় কিংবা গান গাওয়া নিয়ে ঝগড়া, অফিস বা বন্ধু-বান্ধবের সাথে বেশি সময় দেয়া, বিয়ে বহির্ভূত সম্পর্ক,যৌনতায় ভাটা, গায়ে হাত তোলা, ব্যক্তিত্বের দ্বন্দ্বসহ আরও অনেক কারণে বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে থাকে। ভালোবাসা বা প্রেমের সমস্যা হচ্ছে এটা একটা মুদ্রার মতো। একপিঠে ভালোবাসা থাকলে অন্যপিঠে থাকে ঘৃণা। বিয়ের পর ভালোবাসা নাকি খুব দ্রুত ঘৃণার দিকে যায়। তাই কৌতুক ছড়ায় এমন-

স্ত্রী: ডার্লিং বিয়ের দশম বছর পূর্তিতে তোমাকে নিয়ে রবিনসন ক্রুশো যেই দ্বীপে ছিল সেই দ্বীপে যাবো!

স্বামী (আনন্দে আত্মহারা হয়ে): তাহলে পঁচিশ বছর পূর্তি কীভাবে পালন করবে?

স্ত্রী: সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে পঁচিশতম বছরে তোমাকে ঐ দ্বীপ থেকে মুক্ত করে আনবো!

কিন্তু গানে আছে- "মুক্তি মেলে না সহজে/জড়ালে যে হৃদয়ের ঋণে/ বেশি কিছু আশা করা ভুল…"। সংসারে বেশি কিছু আশা করা হয়তো ভুল। খুব সামান্য কারণে এখানে বিচ্ছেদ হয়। বিয়ের পর মেয়ের সংসারে বাবা মা এসেছে বেড়াতে। ছেলের বাবা মায়ের চেয়ে মেয়ের বাবা-মাকে বেশি অ্যাপ্যায়ন করা হয়েছে এ ঝগড়া থেকে বিচ্ছেদ হয়। বউ ভালোবাসে বেড়াল। জামাই পালে কুকুর। এ দ্বন্দ্বেও সংসার ভাঙ্গে। পঞ্চাশ বছরের সংসার। হঠাৎ করে স্ত্রীর ট্রাংকে পাওয়া গেল কিশোরকালে তার কাছে লেখা এক প্রেমিকের প্রেমের চিঠি। আর যায় কোথায়? বিচ্ছেদ! স্বামী তার অফিসে নতুন এক সুন্দরী পিএস রেখেছে। সর্বনাশ, বিয়ে বিচ্ছেদ! বউ তার অফিস কলিগের বাসায় দাওয়াত খেতে গেছে। শোরগোল। ঝগড়া, তারপর বিয়ে বিচ্ছেদ। জামাই কেরুর মদ খায়। বউয়ের কেরুর গন্ধ পছন্দ না। সুতরাং বিচ্ছেদ। বউ রাত জেগে ফেইসবুকিং করে। ঝেটিয়ে বিদায় করো। বিচ্ছেদ। বউ পার্টিতে উদ্দাম নাচে। বিচ্ছেদ। বিয়ের পরেও বউ অভিনয় বা গানের প্রতি আসক্ত। বিচ্ছেদ। বিয়ের পরেও জামাই মদ খেয়ে বাসায় ফেরে। মুখ থেকে গন্ধ আসে। সুতরাং ইতি টানো সম্পর্কের।আসলে বিচ্ছেদ ভালোবাসা আর ঘৃণার মুদ্রাটা নিয়ে বেশি বেশি খেলে। বিচ্ছেদের সময় স্বামী স্ত্রীর, স্ত্রী স্বামীর চরিত্র নিয়ে টানাটানি করে। তখন হয়তো মনে থাকে না যে একদিন তাদের ভেতর কী ভীষণ ভালোবাসাবাসি ছিল।

স্বামী স্ত্রী ভালোবাসাবাসিটা ভুলুক আর নাই ভুলুক, মিডিয়া পৃথিবীর আলোচিত বিচ্ছেদগুলোকে খবরের শিরোনাম করে। যেমন ২০২১ এর মে মাসে বিচ্ছেদ হলো পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ধনীদের একজন বিল গেটস ও তার স্ত্রী মেলিন্ডার। আমাজন খ্যাত জেফ বেজোস ও ম্যাকেঞ্জির বিচ্ছেদ নিয়েও প্রচুর খবরাখবর হয়েছে। ম্যাকেঞ্জি জেফ বেজোসের কাছ থেকে প্রায় ৬৯ বিলিয়ন পেয়েছিলেন ক্ষতিপূরণ হিসেবে। একারণে কেউ কেউ বলে থাকেন ক্যারিয়ারের চেয়ে বরং ডিভোর্স নেওয়াই উত্তম। কাড়ি কাড়ি ডলার পাওয়া যায়!

ম্যাকেঞ্জির মতো আরেকজন ভাগ্যবান রবীন মোরে। বিখ্যাত চলচ্চিত্র অভিনেতা,পরিচালক ও প্রযোজক মেইল গিবসনের সাথে ছাড়াছাড়ি হবার পর রবীন পেয়েছিলেন প্রায় ৪২৫ মিলিয়ন ডলার। এভাবে ডিভোর্সের সময় সঙ্গীত শিল্পী নেইল ডায়মন্ডের স্ত্রী মার্সিয়া মারফি পান ১৫০ মিলিয়ন ডলার। উল্টো ঘটনাও আছে। গাই রিচিকে যখন তার স্ত্রী সঙ্গীত শিল্পী ম্যাডোনা ডিভোর্স দেন তখন ম্যাডোনাকে গুনতে হয়েছিল প্রায় ৮৫ মিলিয়ন ডলার। এমন আলোচিত ডিভোর্স হয়েছে বিশ্ববিখ্যাত বাস্কেটবল খেলোয়াড় মাইকেল জর্ডান ও তার স্ত্রী জুয়ানিতা, হ্যারিসন ফোর্ড ও তার স্ত্রী ম্যালিসা ম্যাথিসন, রাশিয়ান ধনকুবের দিমিত্রি রাইবোলভলে ও তার স্ত্রী এবং বিখ্যাত ফরাসি আর্ট ডিলার এলেক উইল্ডেন্সটাইন ও তার স্ত্রী জসলিনের সাথে। ভালোবাসাবাসি শেষের সাথে সাথে বিচ্ছেদ চূড়ান্ত করতেও টাকার প্রয়োজন! সম্ভবত একারণেই বকুল ফুলের মালা বিনিময় করে একবারই বিয়ে হয়েছিল বাংলাদেশে। পরবর্তীকালে কেউ আর ’ফুলে’র দিকে যায় নি,কাবিনের টাকার দিকেই মনোযোগী হয়েছে। মেলিন্ডা আর বিল গেটসের বিচ্ছেদেও বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ হবে।

বিচ্ছেদ নিয়ে কৌতুকও কম নেই। যেমন- বিয়ে বিচ্ছেদের জন্য আদালতে হাজির হয়েছে স্বামী স্ত্রী। সাথে ফুটফুটে এক সন্তান। বিচারক সন্তানটাকে দেখে বললেন- এত সুন্দর একটা বাচ্চাকে পেয়েও আপনারা ডিভোর্সের জন্য এসেছেন? স্ত্রী রাগতস্বরে জবাব দিলেন- মিনসের যদি সেই যোগ্যতাও থাকতো তাহলে অন্যের উপর ভর করতে হতো না!

উল্টো ঘটনাও আছে। ডিভোর্সের জন্য এসেছে স্বামী-স্ত্রী ও তিন বাচ্চা। স্ত্রীর দাবি -সম্পদের সাথে সাথে সন্তানেরও সমান ভাগ তার চাই। বিচারক অসহায় ভঙ্গিতে বললেন-তিন সন্তানকে ভাগ করার ক্ষমতা আমার নেই। স্ত্রী খেঁকিয়ে উঠে বললো- আমার আছে। এক দেড় বছর পর ঠিকই আমি চার সন্তান নিয়ে এখানে হাজির হবো!

তবে বিচ্ছেদের পরেও বহুদিন একা একা থাকার রেওয়াজ আছে। গল্প বা কৌতুক ছড়ায় সেটা নিয়েও। যেমন-

প্রেম করে বিয়ে করার পরও নেলসন আর বেলার মধ্যে ডিভোর্স হয়েছিল সাত বছর আগে। সাত বছর পর হঠাৎ তাদের দেখা । পুরোনো প্রেম উথলে উঠলে বেলা তার বাসায় নিয়ে এলো নেলসনকে। কফি বানিয়ে আনলো প্রথম। কোল্ড কফি। বেলা বললো- তুমি সবচেয়ে বেশি খেতে এটা। নেলসনের জবাব-

-ছেড়ে দিয়েছি।

রেলা- কীভাবে সম্ভব?

নেলসন- উইল পাওয়ার।

এরপর বেলা চুরুট নিয়ে আসলো। দেবার পর নেলসন বললো-

– ছেড়ে দিয়েছি।

বেলা- কীভাবে সম্ভব?

নেলসন- উইল পাওয়ার। এরপর নেলসনের সবচেয়ে প্রিয় হুইস্কি নিয়ে এলো বেলা। নেলসন এবারও জানালো-ছেড়ে দিয়েছি এবং এটা উইল পাওয়ার।

শেষমেষ বেলা নিজেকে মেলে ধরে বললো- এবার তাহলে দয়া করে আমাকে নাও!

নেলসন এবার অসহায় ভঙ্গিতে বললো- সরি। আই ক্যান নট। দিস টাইম ’পাওয়ার ফেইলর!’

পৃথিবীতে প্রেম ভালোবাসা, বিয়ে কিংবা বিচ্ছেদ ’পাওয়ার ফেইলর’দের জন্য নয়! সবকিছু ’পাওয়ারওয়ালা’দের জন্য। পাওয়ার থাকলে নির্দিষ্ট হয়ে একজন আপনার বউ হিসেবে থাকবে ঘরে,কোন কোন সময়ে কোন একজন একলাখ টাকা ভাড়ার ফ্ল্যাটে কিংবা দুবাইয়ের কোন প্রমোদতরীতে। ’পাওয়ার’ থাকলে আপনার বিচ্ছেদের সময়ও মিডিয়া এটা নিয়ে শিরোনাম করবে।

টাকা না থাকলে আপনি আলোচনাতেই আসবেন না, মরে গেলে আপনার জন্য হয়তো আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলাম!

তবুও ভালোবাসা দিয়ে নিজের ঘরটা আলোকিত রাখুন।



এ দিকে বিল গেটসের এই বিবাহ বিচ্ছেদের সঠিক কারন এখনো জানা যায়নি। আর এটি জানতেই মরিয়া বিশ্বের সবাই। সম্প্রতি তারা দুজনেই তাদের বিচ্ছেদের খবর জানিয়ে দেন স্যোশাল মিডিয়াতে। আর সেই থেকেই শুরু হয় এ নিয়ে নানা ধরনের জল্পনা কল্পনা। তবে শেষ পর্যন্ত তারা আর এ নিয়ে কোন ধরনের কথা বলেননি।

News Page Below Ad