গেল বছর বাংলাদেশে একটি ঘটনা বেশ সাড়া ফেলে দিয়েছিল।সাংসদ হাজী সেলিম এবং তার পুত্রকে নিয়ে গেল বছর ঘটে গেছে বেশ কিছু ঘটনা। যা সাড়া ফেলে দিয়েছিল সবখানে। বিশেষ করে নৌ-বাহিনীর এক কর্মকর্তাকে মারধরনের ঘটনায় আর নামে হয় মামলা। এবং এ নিয়ে তিনি থাকেন বেশ কিছু মাস কারাগারে। এ দিকে সম্প্রতি মুক্তি পেয়েছেন ইরফান সেলিম। আর এ নিয়ে এবার একটি বিশেষ লেখনি লিখেছেন দেশের বিশিষ্ট নারী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ব্যরিস্টার রুমিন ফারহানা। পাঠকদের উদ্দেশ্যে তার সেই লেখনি তুলে ধরা হলো হুবহু:- এই দেশে ক্ষমতার উৎস মূলত দুইটা– রাজনীতি এবং ব্যবসা। দীর্ঘদিন এ দেশে ব্যবসায়ীরা রাজনীতিবিদদের পৃষ্ঠপোষকতা করলেও সরাসরি রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছেন খুব বেশি দিন নয়। বিষয়টা অনেকটা এমন, পেছন থেকে অর্থ জোগান দিয়ে কাউকে যদি ক্ষমতাশালী করতেই হয় তাহলে সেটা নিজেকেই নয় কেন? যার ফল দাঁড়িয়েছে ইউনিয়ন পর্যায় থেকে জাতীয় সংসদ পর্যন্ত সকল পর্যায়ে ব্যবসায়ীর ’বাম্পার ফলন’। রাজনীতি উত্তরোত্তর ব্যয়বহুল হয়ে এখন এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছে যে এক জাতীয় নির্বাচনের খরচ দিয়ে যেকোনও ব্যক্তি বেশ বড় মাপের ব্যবসা দাঁড় করিয়ে ফেলতে পারে।
পাকিস্তান আমলে ব্যবসায়ীদের আভিজাত্য ছিল, শিক্ষার দ্যুতি ছিল এবং সৎভাবে ব্যবসা করে প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হবার মানসিকতা ছিল। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে আঙুল ফুলে কলাগাছ শ্রেণির উদ্ভব হয়। খুব ছোট ব্যবসা থেকে কিছু টাকা বানিয়ে হঠাৎ করে নানা সময়ে সরকারের সাথে যোগসাজশে পণ্যের সংকট তৈরি করে দেশে উৎপাদিত কিংবা আমদানিকৃত নিত্য ব্যবহার্য পণ্যে অকল্পনীয় মুনাফা, অবৈধভাবে সরকারি খাস জমি, নদী, বন দখল, মানুষের জমি দখল করে আবাসন প্রকল্প, ব্যাংকের টাকা নিয়ে মেরে দেওয়া, ভ্যাট-ট্যাক্স ফাঁকি দেওয়া, মাদকসহ নানা অবৈধ পণ্যের ব্যবসা, অকল্পনীয় ব্যয়ে সরকারি টেন্ডারের কাজ এবং ব্যাংক প্রসব করে অসীম টাকার মালিক হয়েছে অনেক ব্যবসায়ী। যাদের জীবনের শুরুটা হয়তো ছিল বিড়ি বানানো, সদর ঘাটে পান বিক্রি, রাস্তায় কিছু ফেরি করা। এদের না ছিল শিক্ষা, না কোনও মূল্যবোধ, না সামাজিক অবস্থান। এদের হাতেই যখন হাজার কোটি টাকা এসেছে তার ফল কি হয়েছে তা এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে দেশের মানুষ।

ওয়ারেন বাফেট, বিল গেটস কিংবা ঘরের পাশে টাটা এবং আজিম প্রেমজির মতো মানবতাবাদী, দানশীল, উঁচু মাপের মানুষ নাই পেতে পারি কিন্তু বাংলাদেশে গত ৫০ বছরে যে মাপের হাজার কোটি টাকার মালিক পেয়েছি সেটা সত্যিই দুর্ভাগ্যজনক। তাদের বেশিরভাগই আবার এক প্রজন্মে হাজার কোটি টাকা বানিয়ে সন্তুষ্ট নয়, তারা রাজনৈতিকভাবেও ক্ষমতায়িত হতে চায়। আমাদের রাজনৈতিক দৈন্য তাদের সেই সুযোগও করে দিয়েছে। আর কোনও ব্যক্তি যখন একই সঙ্গে রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক শক্তির অধিকারী হয় এবং তার দাপটের জায়গাটা হয়, ভেঙে পড়া রাষ্ট্রকাঠামো তখন কী হতে পারে তার বেশ কিছু নজির আমরা নিকট অতীতে দেখেছি।

গত বছরের ২৫ অক্টোবর ঢাকার রাস্তায় এক অতি ’পরাক্রমশালী মানুষ’ হাজি সেলিমের পুত্র ইরফান সেলিমকে ’ঝামেলা’য় পড়তে দেখি। রাস্তায় কারও মোটরসাইকেল বা অন্য গাড়ির সঙ্গে তাদের ’প্রকাণ্ড’ গাড়ির ধাক্কা লাগলে সচরাচর তারা নিশ্চয়ই সেই বাইক/গাড়ির মালিককে চড়-থাপ্পড় মারেন; মার খাওয়া লোকও নিশ্চয়ই প্রাণে বেঁচে গেছেন ভেবে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে মাথা নিচু করে বাসায় ফিরেন। এমপি মন্ত্রী বা বড় ব্যবসায়ীর গাড়ির সঙ্গে কারও ধাক্কা লাগলে সেই ধাক্কা যে কতদূর নিতে পারে তার ধারণা এই দেশের মানুষের আছে। জনাব ইরফানের দুর্ভাগ্য, তার গাড়ির সঙ্গে ধাক্কা খায় জনৈক নৌবাহিনীর অফিসারের বাইক। তাই ইরফান দেহরক্ষীসহ তাকে পেটানোর ঘটনায় সাময়িক সরকারি রোষের শিকার হন। যার ওপর আঘাত এসেছিল তিনিও এই রাষ্ট্রের প্রভাবশালীদের একজন। সুতরাং এই ক্ষেত্রে ঘটনার এখানেই ইতি ঘটলো না।

ঘটনার পরদিন ২৬ অক্টোবর পুরান ঢাকার বড় কাটরায় ইরফানের বাবা হাজী সেলিমের বাড়িতে দিনভর অভিযান চালালো র‌্যাব। এ সময় র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত মাদক রাখার দায়ে ইরফান সেলিমকে এক বছর কারাদণ্ডও দিলেন। ইরফানের দেহরক্ষী মো. জাহিদকে ওয়াকিটকি বহন করার দায়ে দিলেন ছয় মাসের সাজা। ইরফান সাহেবের বাসা থেকে অবৈধ অস্ত্রও উদ্ধার দেখানো হলো। এরপর শেষমেশ ২৮ অক্টোবর চকবাজার থানায় ইরফান সেলিম ও তার দেহরক্ষী জাহিদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ও মাদক আইনে পৃথক চারটি মামলা করে র‌্যাব-৩।

দেখা যাক ইরফান সেলিমের মামলাগুলোর ভাগ্যে কী ঘটেছে। পুলিশ তার বিরুদ্ধে দায়ের করা অস্ত্র এবং মাদক মামলার চার্জশিট দেয় গত ৫ জানুয়ারি, যাতে তাকে এসব অপরাধ থেকে মুক্তি দেওয়া হয়। চার্জশিটে আরও কিছু কারণের সঙ্গে বলা হয়, তার বাসা থেকে যে পিস্তলটি উদ্ধার করা হয়েছিল, সেটি ইরফান সেলিমের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার নষ্ট করতে অসৎ উদ্দেশ্যে কে বা কারা রেখে যায়। অর্থাৎ সেটি তার অস্ত্র ছিল না। তার বিরুদ্ধে মাদক মামলার চার্জশিটেও পুলিশ বলেছে, ইরফান সেলিমের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার নষ্ট করতে অসৎ উদ্দেশ্যে কে বা কারা বিদেশি মদ ও বিয়ার তার বাসায় রেখে যায়। অর্থাৎ আমাদের এটা বিশ্বাস করতে বলা হচ্ছে প্রবল পরাক্রমশালী এমপি এবং তার কমিশনার পুত্রের বাসায় (পড়ুন সাম্রাজ্যে) এসব রেখে যাবার সুযোগ, সাহস, ক্ষমতা আশপাশের মানুষের আছে।

ইরফান সেলিমের বাসায় র‌্যাবের দলটির অভিযানের সময় যে ভ্রাম্যমাণ আদালত জনাব ইরফান সেলিমকে সাজা দেয় সেটি পরিচালনা করেছিলেন অতি আলোচিত ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম। আমাদের অনেকে স্তম্ভিত হবেন এটা জেনে যে, পুলিশি তদন্তের সময় নাকি জনাব আলম পুলিশের সঙ্গে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।

এরপর ঘটেছে আরও অবিশ্বাস্য কাণ্ড, অস্ত্র এবং মাদক মামলার চার্জশিট আদালত গ্রহণ করে তাকে এই মামলাগুলো থেকে মুক্তি দিয়ে দিয়েছে। অর্থাৎ জনাব ইরফান সেলিমের বিরুদ্ধে বাকি থাকবে একমাত্র মামলা যেটি দায়ের করা হয়েছে নৌবাহিনীর কর্মকর্তাকে মারধরের ঘটনায়।

এই মামলায় সম্প্রতি জনাব ইরফান উচ্চ আদালত থেকে জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। এই জামিনের ঘটনা নিয়ে মানুষ ফেসবুকে খুব ক্ষোভ-উষ্মা প্রকাশ করছেন। বাবা সরকারি দলের অতি ধনী প্রভাবশালী নেতা (!) এবং সংসদ সদস্য, শ্বশুর সরকারি দলের এমপি, শাশুড়ি উপজেলা চেয়ারম্যান, নিজে ঢাকা সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ড কমিশনার – এমন একজন প্রভাবশালী মানুষ ইরফানের জেলে যাওয়াটা মানুষকে যতটা আশাবাদী করেছিল, ঠিক ততটা কিংবা তার চেয়েও বেশি ক্ষুব্ধ করেছে তার বেরিয়ে আসাটা। যদিও একজন আইনজীবী হিসাবে জানি তার জামিনে বেরিয়ে আসাটা খুব আইনি ব্যত্যয় না। চরম ব্যত্যয় বরং ঘটেছিল তার অস্ত্র আর মাদক মামলার ক্ষেত্রে। চরম ব্যত্যয় ঘটেছিল যখন পুলিশ তার তদন্ত রিপোর্টে বলেছিল সব সাজানো হয়েছে ইরফানকে ফাঁসানোর জন্য, যখন ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলমকে আর পাওয়া যায়নি পুলিশের সঙ্গে কথা বলার জন্য।

এই দেশের মানুষ ’ঘর পোড়া গরু, সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয়’ অবশ্য পাবারই কথা। তারা জানে এমন একজন মানুষ বেরিয়ে আসা মানে তাদের সব দায় থেকে খালাস পাবার একটা পদক্ষেপ। সেটার একটা আলামতও দেখা গেলো। জেল থেকে বেরিয়েই জনাব ইরফান জানালেন, সেদিনকার রাস্তার ঘটনায় নাকি তিনি উপস্থিতই ছিলেন না। তাহলে কি এই ঘটনার তদন্ত রিপোর্টেও আসতে যাচ্ছে ওইদিনের মারপিটও করেছে অন্য কেউ তার ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করার জন্য? কি দারুণ তাই না?

এই দেশে আইনের প্রয়োগ, মামলার গতি, তদন্তের পরিণতি, জামিন পাওয়া কিংবা না পাওয়া, বিচারের দরজা পর্যন্ত আদৌ পৌঁছতে পারা সবই নির্ভর করে বাদী আর অভিযুক্তের পরিচয়ের ওপর, তাদের পরস্পরের ক্ষমতার ভারসাম্য, অর্থনৈতিক, সামাজিক আর রাজনৈতিক অবস্থানের ওপর। তাই কেউ হয়তো কোনও লেখা বা কার্টুন আঁকার দায়ে মাসের পর মাস কারাগারে থেকে মৃত্যুবরণ করেন, কোনও মামলার তদন্ত রিপোর্ট আবার ৯ বছরেও আলোর মুখ দেখে না। কিছু মামলা আবার এমনও হয় যে আমরা বলতে বাধ্য হই ’কেউ হত্যা করেনি তাকে’। এভাবেই ভাঙে বিচার ব্যবস্থা, ভাঙে আইনের শাসন, রাষ্ট্র হয় গুটিকয় মানুষের।


ব্যরিস্টার রুমিন ফারহানা বাংলাদেশ জাতীয়তাবদি দল বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপদেষ্টা। এ ছাড়াও বর্তমানে তিনি একজন সাংসদ। দীর্ঘদিন ধরেই সংসদে বসে তিনি তার এবং তার দল নিয়ে কথা বলে আসছেন। বিশেষ করে অগ্নী ঝড়া বক্তব্যের কারনেই হয়েছেন বেশ জনপ্রিয়।

News Page Below Ad