গেল বেশ কিছু দিন ধরে বাংলাদেশে চলছে একটি বিষয় নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা সমালোচনা। মুনিয়া নামের এক উঠতি বয়সী তরুণীর মৃত দেহ পাওয়া গেছে গুলশানের একটি অভিজাত ফ্ল্যাটে। আর এ টা নিয়েই এখন সারা দেশে চলছে নানা ধরনের সব আলোচনা সমালোচনা। এবার এ নিয়ে লিখলেন দেশের জনপ্রিয় সংবাদ মাধ্যমের সম্পাদক, খুজিস্তা নূর-ই–নাহারিন (মুন্নি)। পাঠকদের উদ্দেশ্যে তার সেই লেখনি তুলে ধরা হলো হুবহু:-

কি বলবো পুরো ব্যাপারটিতে আমি হতবাক। ফুটফুটে মেয়েটির বয়স আর ছবি দেখলে নিজের মেয়ের কথা মনে পড়ে, প্রায় ওর বয়সের কাছাকাছিই তো। মেয়েকে আমি সবসময় শেখাই পরিশ্রম করে জীবন গড়তে হবে। জীবন চলার পথে কোনো শর্টকার্ট নেই।


ঢাকার অভিজাত শ্রেণিতে উঠা বসাসহ সমস্ত নামকরা ক্লাবের সদস্য হওয়া সত্ত্বেও চেষ্টা করেছি কত সাধারণ ভাবে সন্তানদের মানুষ করা যায়। ওদের বাবা-মায়ের পরিচিতি নাম ডাক সামাজিক অবস্থান থাকা সত্ত্বেও চেয়েছি সন্তানরা পিতা-মাতার ছত্রছায়ায় নয় নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী নিজেদের মেধায় এগিয়ে যাক, নিজেদের পরিচয় নিজেরাই গড়ে নিক। শিখিয়েছি মানুষদের সম্মান করতে হয়, শিখিয়েছি ’তুমি একজন সৎ এবং আদর্শ মানুষ’— এটাই তোমার সবচেয়ে বড় পরিচয়। পৃথিবীর কোন কিছুর বিনিময়েই আত্মসম্মানকে বিকিয়ে দেওয়া যাবে না।

গত কয়েকদিন মুনিয়ার মৃত্যু আমাকে যারপরনাই ব্যথিত করেছে। ওর জীবন আচরণ, উচ্চাভিলাষী মন, জীবনযাপন পদ্ধতি— আমি হতভম্ব। বারবার মনে হয়েছে পিতৃমাতৃহীন মুনিয়ার একজন গার্ডিয়ানের বড় বেশি অভাব ছিল।

’গ্লেমারস ওয়ার্ল্ড’ রূপের বিকিকিনির হাঁট। পা ফেলার আগে জানা দরকার পিছলে পড়ার ভয় আছে, এই জগতটা কতোটা পিচ্ছিল, পঙ্কিল আর ভয়ঙ্কর ! কেবল এক মুনিয়া নয় খুঁজলে লাখো মুনিয়া গুলশান, বনানী, নিকেতন, সচিবালয়ের আশেপাশে সেগুনবাগিচা, পল্টন এলাকা, সংসদ ভবনের চারিপাশ যেখানে ক্ষমতা আর টাকার অবাধ উড়াউড়ি সেখানেই মুনিয়াদের বাস।

ঢাকা শহরের সমস্ত ক্ষমতার কেন্দ্র বিন্দুগুলোতেই সন্ধ্যা নামলেই রূপের পশরা, হাঁকাহাঁকি সওদা। যত এলিট সোসাইটি ততো চড়া দাম। যদিও সত্যতা জানা নেই বাংলাদেশের গত কয়েক বছরের ’বিশ্ব সুন্দরী’’ প্রতিযোগিতাসহ, মডেল, সিনেমার নায়িকাদের পুরষ্কার পাওয়া বিভিন্ন ক্ষেত্রে রিউমার এবং প্রচলিত ধারণা হচ্ছে আগে অনেক জায়গায় হাতবদল হয়ে আসতে হয়।

নামকরা মডেল আর সুন্দরী নায়িকাদের জীবনাচরণের সাথে আয়ের উৎসের বৈসাদৃশ্য এই ধারণাকে আরও পোক্ত করে। ২০০১/২০০২ সময়কালে বেগুনী রঙের ড্রেস পরিহিত বুড়িগঙ্গার তীরে আরেক হতভাগ্য সুন্দরী মডেল তিন্নির নিথর দেহের ছবিটির কথা এখনো মনে পগে। শোনা যায় তিন্নি চাকচিক্য জীবনের হাতছানিতে নায়িকা হওয়ার জন্য নিজের সন্তানকে পর্যন্ত অস্বীকার করতে চেয়েছিল। স্বামী পিয়ালকে অনুরোধ জানিয়ে বলেছিল তাঁর মা হওয়ার কথা কাউকে যেন না বলে। পরিশেষে খল নায়ক অভির হাতে নৃশংস মৃত্যু।

ছোট্ট প্রায় কিশোরী একটি মেয়ে এতো সহজে এতো উচ্চতায় পৌঁছানোর তো কথা নয়! কোন মাধ্যমে কি করে পৌঁছালো! বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে স্বপ্ন সাজানো যতটা সহজ পূরণ হওয়া ততোটা কঠিনই নয় রীতিমত দুঃসাধ্য। সে হয়তো জানতোই না এই জীবনে পিছলে পড়ার ভয় আছে। মেয়েটির দোষ মিথ্যাকে সত্য ভেবে অবাস্তব স্বপ্নের জাল বুনেছিল। কোমল হৃদয় প্রত্যাখ্যাত হওয়া আর স্বপ্ন ভঙ্গের যন্ত্রণা সহ্য করতে পারেনি হয়তোবা। ছোট্ট মেয়েটির জন্য আমার সমবেদনা এবং দোয়া।

মুনিয়ার মৃত্যুর সুষ্ঠু তদন্ত হোক, দোষী সাব্যস্ত হলে বিচার হোক চাই। কিন্তু বেঁচে থাকা তিন্নি, মুনিয়া আর তাঁদের পরিবারকে বলবো শর্টকার্ট রাস্তায় আকাশ ছোঁয়ার চেষ্টা না করে বর্তমান অবস্থায় নিজেকে সুখী ভাবার চেষ্টা করুন।

টাকা অধিকতর দামি বাড়ি, গাড়ি, শাড়ি দিবে কিন্তু কখনো সুখ দিবে না। সুখ সবার ক্ষেত্রে একই কেউ হয়তো খোলা আকাশের নিচে ঘাসের উপর শুয়ে থেকে পায় আবার কেউ হয়তো শত কোটি টাকার বাড়িতে লাখ টাকার বিছানায় শুয়েও পায় না।

বস্তুগত প্রাচুর্যের পেছনে না ঘুরে নিজের হৃদয়ের ঐশ্বর্যের প্রতি মনযোগী হন। ধনাঢ্য পুরুষ নয় নিজেকে নিজের মান সম্মান ইজ্জতকে শ্রদ্ধা করতে শিখুন, নিজের চাওয়া-পাওয়া গুলোর ব্যাপারে সাবধানী এবং সচেতন হোন। এই সমাজে চারিপাশের অনেকেই রূপ-যৌবনের বেসাতি করে ক্ষমতাশীল, ধনী কিংবা সাকসেসফুল হয়েছে সত্য কিন্তু শ্রদ্ধা ভালবাসা পেতে পরিশ্রমের বিকল্প নেই। লাখ টাকা দামের ভাড়া বাসায় অসম্মানের জীবনের চেয়ে ভালোবাসার মানুষের সাথে কুঁড়ে ঘরে থাকা অধিকতর সুখ আর সম্মানের।


এ দিকে এই ঘটনা এখন সব থেকে বেশি যে নামটির নামে উচ্চারন করা হচ্ছে তা হচ্ছে বসুন্ধরার ব্যবস্থাপনা পরিচালক সায়েম সোবহান আনভির। তাকে আদালত থেকে দেয়া হয়েছে দেশ ত্যাগের নিষেধাজ্ঞা। তবে পরবর্তিতে কি পদক্ষেপ নেয়া হবে তাকে নিয়ে জানা যায়নি এখনো।

News Page Below Ad