গেল কয়েক দিন ধরেই বাংলাদেশে একট বিষয় হয়ে আছে টক অব দ্যা টাউন। লকডাউনের ৫ম দিনে রাজধানীতে চলাচলের সময়ে হেনস্থা হয়েছেন এক চিকিৎসক। তবে এটাকে হেনস্থা বলে বাক বিতন্ডতা বললেই সব থেকে বেশি ভালো হয়। চিকিৎসকের তোপে এক প্রকার নুয়ে পড়েছিল প্রথম শ্রেনির ম্যাজিস্ট্রেট এবং ওসি। আর এটা নিয়ে চারিদিকে হয়েছে নানা ধরনের আলোচনা সমালোচনা।এ দিকে এবার এ নিয়ে মুখ খুলেছেন দেশের বিশিষ্ট নারী ব্যক্তিত্ব ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা।পাঠকদের উদ্দেশ্যে তার সেই লেখনি তুলে ধরা হলো হুবহু:-
দৃশ্যটা খুব পরিচিত নয়। ডাক্তারের পোশাক পরা এক নারী প্রাণপণ চিৎকার করে চলেছেন, পুলিশ এবং নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে। ভিডিওটি শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমই নয়, মূলধারার গণমাধ্যমেও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। ঠিক কী কথা দিয়ে আলাপের সূচনা হয়েছিল, সেটি ভিডিওতে না থাকলেও অনুমান করতে পারি। দেশে ’কঠোর লকডাউন’ চলছে। মানুষের চলাচল নিয়ন্ত্রণে সরকার মুভমেন্ট পাস চালু করেছে। এর আওতায় সব নাগরিক রাস্তায় বেরোলে মুভমেন্ট পাস দেখাতে বাধ্য, ১৮ পেশার মানুষ ছাড়া। প্রথম দিন চিকিৎসক এবং চিকিৎসার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা কর্মক্ষেত্রে যাওয়ার সময় বাধার সম্মুখীন হলে সরকার পরে আবারও ঘোষণা দিয়ে বিষয়টি পরিষ্কার করে। এর মধ্যে এই ভিডিওটি ভাইরাল হয় যেখানে প্রচণ্ড বাগ্বিতণ্ডার মধ্যেও কিছু জিনিস খুব স্পষ্ট।

১. ভিডিওতে না থাকলেও আমরা বুঝতে পারি চিকিৎসককে ভ্রাম্যমাণ আদালত থামিয়েছিল এবং তার পেশার পরিচয়পত্র চেয়েছিল। এরপর আমরা ভিডিওতে দেখি চিকিৎসক তার গাড়ির উইন্ডশিল্ডে সাঁটানো বিএসএমএমইউর ইস্যু করা লকডাউনের মুভমেন্ট পাস দেখান। একই সঙ্গে তিনি তার পরনে থাকা অ্যাপ্রোনটিতে লাগানো বিএসএমএমইউর লোগোর দিকেও বারবার দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেন। আমরা জানি বর্তমানের এই দুঃসময়ে নিজেদের জীবন বাজি রেখে কাজ করে যাচ্ছেন যারা তাদের মধ্যে শীর্ষস্থানে আছেন চিকিৎসক এবং হাসপাতালের অন্য সেবাদানকারী ব্যক্তরা। পৃথিবীর সব দেশ যখন এই ফ্রন্টলাইনারদের শুধু অর্থনৈতিক প্রণোদনাই নয়, বরং ভালোবাসা, সম্মান আর শ্রদ্ধাবনত চিত্তে তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছে, তখন এই মানুষগুলোর প্রতি ন্যূনতম শ্রদ্ধা প্রদর্শনে আমরা ব্যর্থ হয়েছি। এমনকি করোনার শুরুতে করোনায় সেবাদানকারী চিকিৎসাকর্মীদের যে প্রণোদনার প্রতিশ্রুতি সরকার দিয়েছিল, আজ অবধি তা আলোর মুখ দেখেনি।

ভীষণ রকম সীমাবদ্ধতা নিয়ে গত এক বছরের বেশি সময় শুধু সদিচ্ছা আর মানবসেবার ব্রত নিয়ে অক্লান্ত পরিশ্রম করে আমাদের সেবা দিয়ে গেছেন এই চিকিৎসাকর্মীরা। করোনার এই দ্বিতীয় ঢেউয়ে পুরো দেশ যখন দিশেহারা, তখন সব প্রমাণ বহনকারী একজন চিকিৎসককে তার আইডি কার্ডের জন্য যখন হেনস্তা করা হয়, সেটা অত্যন্ত দুঃখজনক। আমার ব্যক্তিগত জীবনে চিকিৎসকদের কাছে আমার ঋণ অপরিসীম। অসুস্থ, বয়োবৃদ্ধ বাবা-মাকে নিয়ে যখন একা পথ চলেছি, তখন কোনো আত্মীয় নয়, আমার ভরসার একমাত্র জায়গা এই চিকিৎসাকর্মীরা।

২. ফিরে আসি ঘটনায়। চিকিৎসকের কাছে থাকা তার যাবতীয় পরিচয়পত্র যদি ভ্রাম্যমাণ আদালতের কাছে যথেষ্ট গ্রহণযোগ্য কিংবা বিশ্বাসযোগ্য না হয়, তাহলে তিনি সেটি যাচাই করতেই পারেন। তিনি নিজের ঊর্ধ্বতন কর্র্তৃপক্ষ কিংবা বিএসএমএমইউতেই যাচাই করে নিতে পারতেন। বিএসএমএমইউর দুজন চিকিৎসকের সঙ্গে আমি ব্যক্তিগত উদ্যোগে যোগাযোগ করে জানতে পারি যে হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ সেখানে কর্মরত প্রতিটি চিকিৎসককে লকডাউনে চলাচলের জন্য মুভমেন্ট পাস দিয়েছে এবং মেসেজের মাধ্যমে নিয়মিত স্মরণ করিয়েছে সেই পাস সঙ্গে রাখার জন্য। প্রশ্ন হচ্ছে যথেষ্ট প্রমাণ থাকার পরও কেন একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এবং থানার ওসি চিকিৎসককে এই হয়রানিটা করলেন?

৩. গাড়ির আরোহী একজন চিকিৎসক এবং এটাই তার একমাত্র পরিচয় হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু অবাক বিস্ময়ে দেখলাম তিনি চিৎকার করে বলছেন ’আমি একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান। আমার বাবা একজন বীরবিক্রম।’ সঙ্গে সঙ্গে দায়িত্বে থাকা ম্যাজিস্ট্রেট আর পুলিশ কর্মকর্তাও বলে উঠলেন তারাও মুক্তিযোদ্ধার সন্তান। এ দেশে গত কয়েক বছরে একটা নতুন ’দায়মুক্তির পাস’ তৈরি হয়েছে। যে কেউ যেকোনো অপরাধ করে, অন্যায় করে, নিয়মভঙ্গ করে পার পেতে চাইলে কিংবা নিয়মের বাইরে গিয়ে কোনো সুবিধা নিতে চাইলে তার প্রধান হাতিয়ার এখন মুক্তিযুদ্ধ। এ ঘটনাও তার ব্যতিক্রম নয়। তর্কের প্রথম ধাপেই দুই পক্ষই তাদের পিতৃপরিচয় নিয়ে এলেন। দেশের পরিস্থিতি এখন এমন যে, যারা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান নন কিংবা যাদের ঘরে অন্তত একখানা মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট নেই তারা কার্যত এই দেশের দ্বিতীয়/তৃতীয় শ্রেণির নাগরিক।

একজন নাগরিক স্রেফ একজন নাগরিক হিসেবে তার সাংবিধানিক, আইনগত অধিকার ভোগ করবেন। প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা (সংবিধানের ভাষায় ’প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী’) তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করবেন শুধু তার প্রশাসনিক পরিচয়ে। কিন্তু একজন উচ্চশিক্ষিত নাগরিক এবং প্রজাতন্ত্রের দুজন ক্ষমতাশালী কর্মচারী এসব থেকে সরে গিয়ে ’মুক্তিযোদ্ধার সন্তান’ পরিচয়কে বড় করে তুললেন। মর্মান্তিক ব্যাপার হচ্ছে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করছে যে দেশ সেটি একটি মোটামুটি মানের রিপাবলিক হয়ে ওঠার আশপাশেও নেই।

৪. একপর্যায়ে সেই চিকিৎসক তার মোবাইল ফোন বের করে জনৈক প্রতিমন্ত্রীকে ফোন দেন এবং পুলিশ ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে চাপ দেন তার সঙ্গে কথা বলার জন্য। এ দেশে ক্ষমতা যত সামান্য কিংবা যত বড়ই হোক না কেন কেউ আমরা এক মুহূর্ত দেরি করি না সেটা দেখাতে। আমরা ক্ষমতা দেখাই কারণ সেই দেখানোয় কাজ হয়। ক্ষমতাশীল দলের সঙ্গে থাকা যে কেউ এখন অতি ক্ষমতাধর। সেখানে এই চিকিৎসকের বাবা প্রায় ৩৫ বছর ধরে চিলমারী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্বে আছেন। এ ছাড়া পরপর পাঁচবারের নির্বাচিত উপজেলা চেয়ারম্যান তিনি। সুতরাং তিনি জানেন মন্ত্রী তার ফোন একবারে ধরবেন এবং সেটির চমৎকার প্রয়োগও দেখিয়েছেন তিনি। পুলিশ বা ম্যাজিস্ট্রেট তার কাছে থাকা পরিচয়ে সন্তুষ্ট না হলে অনেক বেশি যৌক্তিক ছিল বিএসএমএমইউর ভিসি বা ঊর্ধ্বতন কাউকে ফোন দেওয়া। কিন্তু তিনি জানেন কোথায় ফোন দিলে কাজ হয় এবং হলোও তাই।

৫. তিনি পুলিশ আর ম্যাজিস্ট্রেটকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছিলেন তার পদমর্যাদার কথা। বিএসএমএমইউর একজন সহযোগী অধ্যাপক একজন যুগ্ম সচিবের পদমর্যাদাধারী। ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স ঘেঁটে দেখলাম একজন সংসদ সদস্যের পদমর্যাদা ১৩ নম্বরে, যা সিনিয়র সচিবেরও ওপরে। যে নিউ মার্কেট থানার ওসিকে নিয়ে এত কাণ্ড সাংসদ অবস্থায় সেই থানার বাইরে আমাকে দুই ঘণ্টা বসে থাকতে হয়েছে শুধু একটা জিডি করার জন্য। এমন অভিজ্ঞতা আমার হয়েছে একাধিকবার। অথচ আওয়ামী লীগের এমপি কিংবা মূল সংগঠনের বড় নেতা দূরেই থাকুক ছাত্রলীগ/যুবলীগের একজন পাতি নেতাও এমন কোনো কাজে থানায় গেলে ’জামাই আদর’ পান।

৬. কল্পনা করা যাক, এ ঘটনার চিকিৎসক এমন কেউ নন যিনি বীরবিক্রম মুক্তিযোদ্ধার সন্তান কিংবা যিনি মুহূর্তেই একজন মন্ত্রীকে ফোন করে ফেলতে পারেন, তাহলে এ ঘটনার শেষ কোথায় দাঁড়াত? কিংবা যদি তিনি হতেন সমাজের একেবারে প্রান্তিক কোনো মানুষ? জানি, কেউ বলেন তেমন হলে এমন ক্ষমতাধর মোবাইল কোর্টের সঙ্গে কেউ এমন কথা বলতেনই না। তবু আলোচনার স্বার্থে ধরে নিই তারাও এ ঘটনার চিকিৎসকের মতো তুই-তোকারি করেছেন কিংবা আপত্তিকর গালি দিয়েছেন। আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি বিখ্যাত ’আইনের হাত’ দেখতেন সরকারি কাজে বাধা সৃষ্টির ফৌজদারি অপরাধে। কিন্তু এই নাটকের শেষ অঙ্কে দেখলাম চুপসে যাওয়া ম্যাজিস্ট্রেট আর পালিয়ে যাওয়া ওসিকে যাকে আবার চিকিৎসক খুঁজছিলেন সরি বলানোর জন্য।

শেষমেশ একটি বাক্য বলে চিকিৎসক, পুলিশ, ম্যাজিস্ট্রেট প্রত্যেকে যার যার অবস্থান থেকে রাষ্ট্রের অবস্থান স্পষ্ট করলেন। হুমকি-ধমকির একপর্যায়ে চিকিৎসক দাবি করলেন, ক্ষমতাকেন্দ্রে তার অবস্থানের কথা। মুহূর্তমাত্র দেরি না করে বাকি দুজন জবাব দিলেন আমরা কি বাইরের? বারবারই বলে আসছিলাম এই রাষ্ট্রটি আর গণমানুষের হয়ে উঠল না কিছুতেই। গত কয়েক বছরে এটি আরও পাকাপোক্তভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে রাষ্ট্রটি শুধু ক্ষমতাসীন দল আর সরকারের সঙ্গে যুক্ত গুটিকয় সুবিধাভোগী মানুষেরই হয়ে রইল। মাত্র কয়েক মিনিটের কথোপকথনেই এই রাষ্ট্রের চেহারা আবারও উন্মোচিত।

এ দিকে এই ভিডিওটি এখনো ছড়িয়ে আছে সবখানে। সকলেই এটা শেয়ার করছেন। অনেকেই করে যাচ্ছেন অনেক মন্তব্যে। অনেকে এটাকে সেই চিকিৎসকের রাগের বহি:প্রকাশ ঘটিয়েছেন আবার অনেকেই এখানে দোষ খুজে পেয়েছেন সেই ওসি ও ম্যজিস্ট্রেটের।

News Page Below Ad