জম্মু-কাশ্মীরে এশিয়ার দীর্ঘতম ’সড়ক টানেল’ চালু করে ইতিহাস সৃষ্টি করেছিল ভারত। এবার দক্ষিণ এশিয়ার এবং দেশের প্রথম ’নদীর তলদেশে টানেল’ নির্মাণ করে আরেক ইতিহাস সৃষ্টি করতে যাচ্ছে চট্টগ্রাম। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কায় নদীর তলদেশে নেই কোনো টানেল। বঙ্গোপসাগরের মিলন মোহনা পতেঙ্গার কর্ণফুলীর অদূরে রচিত হচ্ছে এই নতুন ইতিহাস। আগামী ২৪ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা টানেলের মূল কাজের উদ্বোধন করবেন। টানেল এলাকায় এ নিয়ে চলছে ব্যাপক কর্মযজ্ঞ। বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে চায়না কমিউনিকেশন কনস্ট্রাকশন কোম্পানি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৮ হাজার ৪৪৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে চীন অর্থায়ন করছে প্রায় চার হাজার ৮০০ কোটি টাকা, বাকি টাকা সরকার নিজস্ব তহবিল থেকে ব্যয় করছে। ২০১৬ সালের অক্টোবরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং টানেলের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। নদীর তলদেশের ১৮ থেকে ৪৩ মিটার গভীর দিয়ে নির্মিত হচ্ছে টানেল। এরই মধ্যে প্রকল্পের ২৪ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। ২০২২ সালে টানেল নির্মাণ শেষে গাড়ি চলাচল করার কথা। 
কর্ণফুলী নদীর তলদেশে টানেল নির্মাণ প্রকল্পের পরিচালক প্রকৌশলী হারুনুর রশীদ বলেন, ’কর্ণফুলী টানেল নির্মাণ কাজ দ্রুতগতিতে চলেছে। প্রধানমন্ত্রী প্রকল্পের কাজের ভিত্তিপ্রস্তর করবেন। দেশি-বিদেশি প্রায় ১২০০ কর্মকর্তা-কর্মচারী, শ্রমিক কাজ করছেন। কর্ণফুলী টানেল নির্মাণের মাধ্যমে দেশে একটি ইতিহাস রচিত হচ্ছে।’ প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, টানেল উদ্বোধনের জন্য চলছে দিনরাত তিন শিফটে কাজ। যুক্ত আছেন বুয়েটের ১৪ জনসহ বিদেশি প্রকৌশলীরা। প্রকল্পের পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের অধীনে কাজ করছেন প্রায় ৪০ জন, বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তা-কর্মচারী আছেন ২৫ জনেরও বেশি। কাজ করছেন মোট ৮০০ শ্রমিক। এর মধ্যে চীনের শ্রমিক আছেন ৩৫০ জন। তা ছাড়া অস্থায়ী দৈনিক ভিত্তিতে প্রতিদিন কাজে যুক্ত হচ্ছেন প্রায় ৩০০ শ্রমিক। কাজের মান ঠিক রাখতে তিন ধাপে পরীক্ষা করা হচ্ছে। প্রথম ধাপে আছেন একেবারে মাঠপর্যায়ে কাজে যুক্ত চীন ও বাংলাদেশের প্রকৌশলীরা। এর পরের ধাপে আছে চীনের একটি সুপারভিশন টিম। চূড়ান্ত পর্যায়ে আছে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ।
আরও জানা গেছে, টানেল বোরিং মেশিন (টিবিএম) নামে বিশেষ যন্ত্র দিয়ে নদীর তলদেশে একটি পাকা সড়ক টেনে তৈরি করা হচ্ছে সুড়ঙ্গ পথ। মেশিনটি চীনের তৈরি। কর্ণফুলীর তলদেশ খনন করে একই সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সড়ক পথ তৈরি করবে। প্রায় তিনতলা সমান উঁচু দৈত্যাকৃতির এ যন্ত্র এরই মধ্যে বসেছে কর্ণফুলীর পতেঙ্গা পয়েন্টে। সেখানে ১২ মিটার গভীরে বসানো হয়েছে মেশিনটি। খনন করে সর্বোচ্চ ৪৩ মিটার বা ১৪০ ফুট গভীর পর্যন্ত চলে যাবে। এর মাধ্যমে তৈরি হবে সুড়ঙ্গ পথ। কর্ণফুলী টানেল প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, ’কর্ণফুলী নদীর তলদেশ দিয়ে বহুলেন সড়ক টানেল নির্মাণ’ শীর্ষক চার লেনের দুটি টিউব সংবলিত ৩ দশমিক ৪ কিলোমিটার নদীর তলদেশ দিয়ে ৮৪৪৬ কোটি ৬৩ লাখ টাকায় (সম্ভাব্য) টানেল নির্মিত হচ্ছে। টানেলের পশ্চিম ও পূর্ব প্রান্তে ৫ দশমিক ৩৫ কিলোমিটার অ্যাপ্রোচ সড়ক এবং ৭২৭ মিটার ওভারব্রিজ সম্পন্ন টানেলটি চট্টগ্রাম শহরের সঙ্গে আনোয়ারা উপজেলাকে সংযুক্ত করবে। টানেলের অ্যালাইনমেন্ট হবে চট্টগ্রাম এয়ারপোর্ট থেকে কর্ণফুলী নদীর দুই কিলোমিটার ভাটির দিকে। টানেলের প্রবেশ পথ হবে নেভি কলেজের কাছে, বহির্গমন পথ হবে কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ পাড়ের সিইউএফএল সার কারখানা সংলগ্ন ঘাট। মোট ৯২৬৫ দশমিক ৯৭১ মিটার দৈর্ঘ্যরে প্রকল্পটির মধ্যে টানেলের দৈর্ঘ্য ৩০০৫ মিটার (উভয় পাশের ৪৭৭ মিটার ওপেন কাট ব্যতীত)। টানেলে থাকবে ৯২০ মিটার দৈর্ঘ্যরে দুটি ফ্লাইওভার। এর মধ্যে শহর প্রান্তের ’এট গ্রেড সেকশন’ হবে ৪৬০ মিটারের আর দক্ষিণ প্রান্তের ’এট গ্রেড সেকশন’ হবে ৪৪০৩ দশমিক ৯৭১ মিটারের। দেশের প্রথম এই টানেলটি হবে ’ডুয়েল টু লেন’ টাইপের। টানেল নির্মাণ করা হবে ’শিল্ড ড্রাইভেন মেথড’ পদ্ধতিতে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে বদলে যাবে চট্টগ্রামের চিত্র। গড়ে উঠবে  চট্টগ্রাম শহরের সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন ও যুগোপযোগী সড়ক যোগাযোগ, আধুনিকায়ন হবে বিদ্যমান সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা, সংযোগ স্থাপন হবে এশিয়ান হাইওয়ের সঙ্গে, যুক্ত করা হবে কর্ণফুলী নদীর পূর্ব তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা শহরের সঙ্গে ডাউনটাউনকে, ত্বরান্বিত হবে বিভিন্ন উন্নয়ন কাজ, বৃদ্ধি পাবে চট্টগ্রাম বন্দরের দক্ষতা ও সুযোগ-সুবিধা, গতি পাবে প্রস্তাবিত গভীর সমুদ্রবন্দরের নির্মাণ কাজ, নতুন যোগাযোগ ব্যবস্থা সৃষ্টি হবে ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজারের মধ্যে।