প্রশব-বেদনা তৈরি হলে সন্তানসম্ভবা স্ত্রী খুকিকে গত সোমবার (৩০) সন্ধ্যায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন মো. শরিফ। ওইদিনই দিবাগত রাত ৩টা ২৭ মিনিটে একটি সন্তান জন্ম দেন শরিফের স্ত্রী। কিন্তু নবজাতকের খবরে খুশি হবার বদলে মাত্র আধা ঘণ্টার মধ্যেই শুরু হয় সন্তানটিকে নিয়ে হইচই। পুরো ঢামেকজুড়ে তৈরি হয় তোলপাড়। কারণ সদ্য ভূমিষ্ঠ হওয়া সন্তানকে প্রথমে ডাক্তার ও ধাত্রী ছেলে সন্তান বললেও পরে গিয়ে ডাক্তাররা বলেন যে আসলে নবজাতকটি মেয়ে।
জানা যায়, মো. শরিফের স্ত্রী একটি ছেলে জন্ম দিয়েছেন এই খবর দিয়ে ৫০০ টাকা বকশিস আদায় করেন ওই ধাত্রী। এমনকি ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর ডাক্তারের চিকিৎসাপত্রেও নবজাতকটি ছেলে বলে লেখা হয়। কিন্তু বাচ্চাকে অবজারভেশন রুমে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলে সেখানকার ডাক্তাররা বলেন যে নবজাতকটি মেয়ে কিন্তু কাগজে লেখা তো ছেলে। এমন কথা শুনেই মাথা চক্কর দিয়ে পুরো শরীর দিয়া ঘাম ঝরতে লাগলো শরীফের।

ডাক্তারদের এমন কথা বিশ্বাস করতে পারছিলেন না তিনি। পরে ভালো করে খেয়াল করে দেখেন আসলেই তার কোলের বাচ্চাটি মেয়ে শিশু। এতক্ষণে তার মনে হলো সন্তান বদল হয়ে গেছে। তাই তিনি হাসপাতালের ডাক্তার আর নার্সদের দ্বারে দ্বারে ঘুরে তার ছেলে সন্তান খুঁজতে লাগলেন। কিন্তু কেউ তার ছেলেকে ফিরিয়ে দিতে পারলেন না। সবাই বলছেন প্রথমে যেটিকে ছেলে বলা হয়েছে সেটি মূলত মেয়েই ছিল। ধাত্রী হয়তো মেয়েকে ছেলে বলে বেশি টাকা বকশিস নিতে চেয়েছিল।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের শিশু বিভাগের ২১২ নম্বর ওয়ার্ডের এই ঘটনায় পুরো হাসপাতালজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে। সকলেই বিষয়টি নিয়ে অবাক হয়েছেন। অনেকেই বলছেন, ছেলে শিশু কীভাবে মেয়ে হয়? এটা কীভাবে সম্ভব? যে ধাত্রী এবং চিকিৎসক তার সন্তান ডেলিভারির সময় ছিলেন তাদের দায়িত্বহীনতার কারণে হয়তো মেয়ে শিশুকে ছেলে শিশু ভেবেছেন।

আবার অনেকেই ধারণা করছেন, হয়তো কেউ টাকার বিনিময়ে তার ছেলে শিশুকে পরিবর্তন করে মেয়ে শিশু এনে দিয়েছেন। এ ঘটনায় সন্তানটির পুরো পরিবার অর্থাৎ শরিফের স্বজনরা অভিযোগ করছেন, প্রকৃতপক্ষে তাদের ছেলে সন্তানটি বদল করে মেয়ে সন্তান দেয়া হয়েছে।

শরীফ অভিযোগ করেন, খুকি সন্তান জন্ম দেয়ার পর সেখানে থাকা ধাত্রী স্বজনদের কোলে বাচ্চাটি তুলে দিয়ে বললেন তাদের ছেলে হয়েছে। এজন্য টাকাও দাবি করেন সন্তানের বাবা শরিফের কাছে। ২০০ টাকা দিতে চাইলে ছেলে হয়েছে বলে ওই ধাত্রী আরও টাকা চান। এ জন্য তাকে ৫০০ টাকাও দেয়া হয়। এরপর টাকা নিয়ে বাচ্চাটিকে গোসল করাতে তাদের কাছ থেকে আবার নিয়ে যায় ওই ধাত্রী। আধা ঘণ্টা পর গোসল করিয়ে এনে বাচ্চাটিকে তাদের কাছে দিয়ে চলে যায় ওই ধাত্রী।

সদ্য পিতা হওয়া শরিফ অভিযোগ করে বলেন, ধাত্রী বাচ্চাটাকে গোসল করিয়ে আমার কাছে দিয়ে বললেন, ২১৪ নম্বর রুমে নিয়ে যেতে অবজারভেশন করাতে। সঙ্গে একটা কাগজ (ডেসক্রিপশন) দিলেন ডাক্তারকে দেয়ার জন্য। ওই কাগজ ডেলিভারির সময় যে ডাক্তার ছিলেন তাদের লেখা কাগজ। সেই কাগজ নিয়ে যখন ২১৪ নম্বর রুমে গিয়ে ডাক্তারকে দিলাম তখন তিনি বললেন, এটা তো ছেলের কাগজ কিন্তু আপনার কোলে তো মেয়ে বাচ্চা। এটা কোথায় থেকে এনেছেন। যান আপনার বাচ্চা নিয়ে আসেন আর এটা দিয়ে আসেন।

শরিফ জানায়, ডাক্তারের এমন কথায় সে দ্রুত ওই রুম থেকে বের হয়ে আবারও ২১২ নম্বর রুমে গিয়ে নার্সদের কাছে জানতে চান তাদের বাচ্চা কোথায়? কোলের শিশুটি তাদের বাচ্চা নয়। এমন কথা শুনে নার্সরা তাকে কোনো জবাব দিচ্ছিলেন না। পরে সে চিকিৎসকের কাছে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে বলছেন, ওই মেয়ে শিশুটাই তার। চিকিৎসকরা ভুল করে ছেলে লিখে ফেলেছে। কিন্তু এত বড় ভুল হবার কথা নয় বলে জানান শরিফ।

শরিফের অভিযোগ, ওই হাসপাতালের পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাগজগুলোও এখানকার নার্সরা টানাটানি করে ছিঁড়ে ফেলেছে। ওই কাগজপত্রগুলো তাকে দেয়নি। সবগুলো লুকিয়ে ফেলেছে।

শরীফের দাবি, যদি তার ছেলে সন্তান না হয় তবে কেনো তার কাগজপত্রগুলো তাকে দেয়া হলো না? সেগুলো কেন ছিঁড়ে ফেলা হলো এবং প্রথমে কাগজে ছেলে লিখে এক ঘণ্টা পরে ওই কাগজে কেন ছেলের নাম কেটে মেয়ে লিখলো। এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজেও ভোর থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্তও কোনো সদুত্তর পেলেন না শরিফ। তাই বিকালে তিনি জানান, আইনি প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনে বাচ্চার ডিএনএ টেস্ট করাবেন তিনি।

এ ব্যাপারে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপ-পরিচালক শাহ আলম তালুকদার গণমাধ্যমকে বলেন, বাচ্চা বদলের ব্যাপারটি সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং ভিত্তিহীন। অভিযোগ পেয়ে আমরা সকাল থেকে বিভিন্নভাবে তদন্ত করলাম। কোনোভাবেই অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হয়নি।

তিনি বলেন, গত ২৯ এপ্রিল দুপুর ১২টা থেকে পরের দিন অর্থাৎ ৩০ এপ্রিল দুপুর ১২টা পর্যন্ত হাসপাতালের নারী ও নবজাতক ওয়ার্ডে মোট ২৫ জন রোগী ভর্তি হয়েছিল। তাদের মধ্যে ১৭ জন নরমাল ডেলিভারি এবং ৬ জনের বিভিন্ন অপারেশন করা হয়েছে। বাকি একজনকে ডিএনসি করা হয়েছে। এছাড়া ৩০ এপ্রিল রাত ১২টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত হাসপাতালে মাত্র দুইজন রোগীর ডেলিভারি হয়েছে। একজন নরমাল ডেলভারি অপরজন সিজারিয়ান। নরমাল ডেলিভারি রোগিটাই হলেন খুকি। তার যে সময় ডেলিভারি হয় সে সময় অন্য কারও ডেলিভারি হয়নি। কারণ তার ডেলিভারির তিন ঘণ্টা পর সিজারিয়ান রোগী দুটি জমজ সন্তান জন্ম দেয়। এতে স্পষ্ট যে ওই মেয়ে বাচ্চাটি তাদেরই। তবে চিকিৎকরা হয়তো ভুল করে মেয়ের জায়গায় ছেলে লিখে ফেলেছেন বলে জানান এই কর্মকর্তা।