সারা বিশ্বে এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে একটি মাত্র ঘটনা। আর তা হলো মুসলিমদের প্রথম কেবলা আল আকসা ই’সরায়েলি বাহিনীর হাতে বন্দি। এ নিয়ে এক প্রকার তোলপাড় চলছে সারা বিশ্বে। সবখানেই এ নিয়ে এখন চলছে নানা ধরনের আলোচনা সমালোচনা।ই’সরায়েলি বাহিনীর হাতে ২১ জন ফিলিস্তিনি মু’সলিম নি’হত ও শি’শু নারীসহ ৭০০ আ’হত হয়েছে। আল আকসায় নামাজ আদায় বন্ধ করে দিয়েছে ইহুদি রাষ্ট্রটি। মু’সলমানদের ও’পর ইহুদিদের চ’রম এই নি’র্যাতনের সময় ই’সরায়েলে নি’র্যাতন ও আল আকসার অতীতের কিছু ঘটনা নিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছেন জনপ্রিয় ইসলামি বক্তা মিজানুর রহমান আজহারী। তার স্ট্যাটাসটি পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো-
’মসজিদুল আকসা বা বাইতুল মুকাদ্দাস ইসলামের তৃতীয় পবিত্রতম মসজিদ। যেটি জেরুসালেমের পুরনো শহরে অবস্থিত। এটা মু’সলমানদের কাছে ’বায়তুল মোকাদ্দাস বা ’আল আকসা’ মসজিদ নামে পরিচিত। ইসলামি স্থাপনার প্রাচীন এই নমুনাটি মু’সলমান, খ্রিস্টান ও ইহুদি তিন ধর্মাবলম্বীদের কাছে সমানভাবে পবিত্র ও গুরুত্বপূর্ণ। ঈসা (আ.) এবং মরিয়ম (আ.) এর সাথে প্রাচীনতম ইবাদত গৃহ বায়তুল মুকাদ্দাস বা মসজিদে আকসার সম্পর্ক সুনিবিড়ভাবে জ’ড়িত।

মু’সলিম’দের কাছে আল আকসা মসজিদ নামে পরিচিত স্থাপনাটি ইহুদিদের কাছে ’টেম্পল মাউন্ট’ নামে পরিচিত। আল আকসা হচ্ছে- ইসলামের প্রথম কেবলা এবং মক্কা ও ম’দিনার পর তৃতীয় পবিত্র স্থান। মসজিদুল আকসায় এক রাকাত নামাজ আদায় করলে ২৫০ অন্য বর্ণনায় ৫০০ রাকাতের সাওয়াব পাওয়া যায়। শেষ জামানার ঘটনাবলির কারণেও এ এলাকাটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই অঞ্চলেই দাজ্জাল ও ঈসা (আ.) এর আগমন ঘটবে।

বিশ্বনবী (সা.) মিরাজের রাতে মসজিদুল হারাম থেকে আল-আকসা মসজিদে এসেছিলেন এবং এখান থেকেই তিনি ঊর্ধ্বাকাশের দিকে যাত্রা করেন। বিশ্বনবী (সা.) মিরাজ গমনের প্রাক্কালে এই মসজিদে সব নবি–রাসুলের ইমামতি করে নামাজ আদায় করেন। এতে তিনি ’ইমামুল আম্বিয়া’ অর্থাৎ সকল নবির ইমাম ও ’সায়্যিদুল মুরসালিন’ তথা সব রাসুলের নেতা হিসেবে স্বীকৃত হন। এ এলাকাটি অসংখ্য নবি–রাসুলের স্মৃ’তিবিজ’ড়িত, এর আশপাশে অনেক নবি–রাসুলের কবর রয়েছে। প্রাচীনকাল থেকেই এই অঞ্চলটি ওহি অবতরণের স্থল, ইসলামের কেন্দ্র, ইসলামি সংস্কৃতির চারণভূমি ও ইসলাম প্রচারের লালনক্ষেত্র হিসেবে প্রসিদ্ধ। আল আকসা মসজিদের গুরুত্বের আরও একটি বড় কারণ হলো, রাসুল (সা.) নবুয়ত প্রাপ্তির পর থেকে টানা ১৪ বছর পর্যন্ত আকসা মসজিদই ছিল মু’সলিম’দের কিবলা। মক্কায় যখন রাসুল (সা.) নামাজ পড়তেন তখন বায়তুল মোকাদ্দাস অভিমুখী হয়ে দাঁড়ালেও ক্বাবাকে তিনি সামনে রাখতেন। হিজরতের ১৬/১৭ মাস পর মহান আল্লাহর নির্দেশে মু’সলমানদের কেবলা বায়তুল মোকাদ্দাস থেকে মক্কার দিকে স্থায়ীভাবে পরিবর্তিত হয়।

বিশুদ্ধ মতানুসারে সর্ব প্রথম আদম (আ.) মসজিদুল আকসার ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন। ইমাম কুরতুবির মতে এই মসজিদটি প্রথম নির্মাণ করেন আদম (আ.) এর কোন এক স’ন্তান। ইবনে হাজার আল-আস্কালানি নূহ (আ.) এর স’ন্তান সাম এর কথাও উল্লেখ করেছেন। পরবর্তীতে এই মসজিদটি পুনঃনির্মাণ করেছিলেন ইব্রাহিম (আ.) এর স’ন্তান নবি ইসহাক (আ.) ও পরিপূর্ণ করেছিলেন নবি সুলাইমান (আ.)। বনি ইসরাইলের ধার্মিক লোকজন এই বায়তুল মুকাদ্দাস বা মসজিদুল আকসায় আল্লাহ তা’আলার উপাসনায় মগ্ন থাকতো।

ইতিহাসের সুদীর্ঘ পথ পরিক্রমা শেষে খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাবের আমলে জেরুসালেম বিজয় হলে বর্তমান মসজিদের স্থানে তিনি একটি মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন। পরবর্তীতে উমাইয়া খলিফা আবদুল মালিকের যুগে মসজিদটি পুনর্নির্মাণ ও সম্প্রসারিত হয়। ৭৪৬ খ্রিস্টাব্দে ভূমিকম্পে মসজিদটি ধ্বং’সপ্রাপ্ত হলে আব্বাসীয় খলিফা আল মনসুর এটি পুনর্নির্মাণ করেন। পরে খলিফা আল-মাহদি এর পূনর্নির্মাণ করেন। ১০৩৩ খৃস্টাব্দে আরেকটি ভূমিকম্পে মসজিদটি ক্ষ’তিগ্রস্ত হলে ফাতিমি খলিফা আলি আজ-জাহির পুনরায় মসজিদটি নির্মাণ করেন, যা অদ্যবধি টিকে আছে।

১০৯৯ খ্রিস্টাব্দে ক্রুসেডাররা জেরুজালেম দ’খল করার পর তারা মসজিদটিকে একটি প্রাসাদ এবং মসজিদ প্রাঙ্গণে অবস্থিত কুব্বাতুস সাখরাকে গির্জা হিসেবে ব্যবহার করত। মু’সলিম বীর সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবি জেরুসালেম পুনরায় জয় করার পর মসজিদ হিসেবে এর ব্যবহার পুনরায় শুরু হয়। আইয়ুবি, মামলুক, উসমানি, সুপ্রিম মু’সলিম কাউন্সিল ও জর্ডানের তত্ত্বাবধানে এর নানাবিধ সংস্কার করা হয়। বর্তমানে পুরনো শহরটি ইসরায়েলিদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ইসলামের তৃতীয় বৃহত্তম ঐতিহাসিক এ মসজিদটির ও’পর চলছে যায়োনিস্ট ইহুদিদের আগ্রাসন। অ’বৈধভাবে গড়ে ওঠা রাষ্ট্র ই’সরায়েল ১৯৬৭ সালে ’মসজিদুল আকসা’ জবরদ’খল করে নেয়। এরপর থেকে সেখানকার মু’সলিম জনগণ মুক্তি ও স্বাধীনতার জন্য তাদের সংগ্রাম চা’লিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু জায়ানবা’দী ই’সরায়েল একের পর এক মু’সলিম–অধ্যুষিত এলাকা জবরদ’খল করে ইহুদি বসতি সম্প্রসারণ অব্যাহত রাখে।

বর্তমানে এ মসজিদে প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত। ইসরাইলের মু’সলিম বাসিন্দা এবং পূর্ব জেরুজালেমে বসবাসরত ফিলিস্তিনিরা মসজিদুল আকসায় প্রবেশ ও নামাজ আদায় করতে পারে। আবার অনেক সময় তাদের বাঁ’ধাও দেওয়া হয়। এই বিধিনিষেধের মাত্রা সময়ে সময়ে পরিবর্তন হয়। কখনও শুধু জুমার নামাজের সময় বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। গাজার অধিবাসীদের জন্য বিধিনিষেধ অনেক বেশি ক’ঠোর। আমরা মহান আল্লাহ তা’আলার দরবারে কায়মনোবাক্যে ফরিয়াদ জানাই, তিনি যেন আবারো আমাদেরকে কুদস বিজয়ের তাওফিক দেন এবং মসজিদুল আকসা পুনরুদ্ধার করার হিম্মত নসিব করেন’।


এদিকে আল আকসার এমন ঘটনা নিয়ে তিব্র নিন্দা শুরু হয়েছে সারা বিশ্বে। সবাই এ ঘটনার তিব্র নিন্দা জানিয়ে দিয়েছে নানা ধরনের বিবৃতি। গতকাল এ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও তার প্রতিবাদের ভাষা তুলে ধরেছেন। এ ছাড়াও বাংলাদেশের স্যোশাল মিডিয়া সাইটে এ নিয়ে এখনো চলছে নানা ধরনের প্রতিবাদ।

News Page Below Ad